• +91 6291642485
  • 6291642485
Banner

খেলার বিভাগ > ক্রিকেট

ডালমিয়া পরিবারকেই বিসর্জন বিশ্বরূপের

জগমোহন ডালমিয়ার মূর্তি স্থাপন, নেই পুত্র। 

এ যেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'দীনদান' কবিতাটি মনে করিয়ে দিচ্ছে! 
বিশ্বকবির ওই কবিতায় যেমন শেষ পংক্তিতে লেখা ছিল 'সে মন্দিরে দেব নাই।'
সে রকম ঘটনা শনিবার ঘটে গেল কলকাতায়। নেপথ্যে বাংলা তথা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড তথা এশিয়া এবং বিশ্ব ক্রিকেটের শ্রেষ্ঠতম প্রশাসক প্রয়াত জগমোহন ডালমিয়ার দশম মৃত্যুবার্ষিকী। যেখানে তার 'স্বঘোষিত' শিষ্য বিশ্বরূপ দে প্রয়াত ডালমিয়াজির মূর্তি স্থাপন করে দেখালেন তিনি কত বড় ডালমিয়া ভক্ত। কিন্তু সেই অনুষ্ঠানে তিনি তার সুযোগ্য পুত্র অভিষেক ডালমিয়াকে আমন্ত্রণ জানাতেই ভুলে গেলেন। অভিষেক বর্তমানে আইপিএল পরিচালন সমিতিতে রয়েছেন। বিশ্বরূপ বাবুর সঙ্গে ডালমিয়া পরিবারের দুর্দান্ত সম্পর্ক ছিল কয়েক মাস আগেও। কিন্তু ভোট বড় বালাই। ২২ সেপ্টেম্বর সিএবির ভোট। সেখানে সারা জীবন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের নীতি বিরোধী বিশ্বরূপ বাবু, কোন এক অজ্ঞাত কারণে হঠাৎ সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়- মিত্র হয়ে উঠেছেন। ময়দানে ফিশফাস যে সেই কারণেই বিশ্বরূপ বাবুর দ্বারা ডালমিয়াজির মূর্তি উন্মোচন এর অনুষ্ঠানে নাকি ডাক পাননি অভিষেক ডালমিয়া। কারণ বছর পেরোলে আরও বড় ভোট অপেক্ষা করে আছে বিশ্বরূপ বাবুর কাছে। তাই ভোট রাজনীতির গোলকধাঁধায় তিনি ডালমিয়া পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কই বিসর্জন দিয়েছেন মহালয়ার আগে গুরুতর্পণ করতে গিয়ে। 
বিশ্ববরেণ্য ক্রিকেট প্রশাসক শ্রদ্ধেয় জগমোহন ডালমিয়ার দশম প্রয়াণ বার্ষিকীতে তাঁর আবক্ষ মূর্তি  উন্মোচনে উপস্থিত ছিলেন সিএবি - র বর্ষীয়ান সদস্য শ্রী রবি মিত্র,সিএবি সভাপতি শ্রী স্নেহাশীষ গাঙ্গুলী, সিএবি-র দুই প্রাক্তন যুগ্ম সচিব শ্রী বাবলু কোলে ও সুবীর গাঙ্গুলী সহ একঝাঁক ক্রিকেট প্রশাসক। কিন্তু ছিলেন না তাঁর ছেলেই। অভিষেক যদিও ১০ নম্বর আলিপুর রোডে তাদের বাসভবনে বাবাকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছেন। সেখানে হাজির ছিলেন সিএবির অনেক কর্তাই। কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে তারা নিজেদের নাম প্রকাশ্যে আনতে নারাজ।
জগমোহন ডালমিয়া ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসের এক অনন্য প্রশাসক, যিনি ভারতীয় ক্রিকেটকে বিশ্বমঞ্চে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৪০ সালের ৩০শে মে কলকাতায় জন্ম নেওয়া ডালমিয়াজি শৈশবেই ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি ক্লাব স্তরে উইকেটকিপার ও ওপেনার হিসেবে খেলতেন। তবে মাঠে নয়, প্রকৃত ইতিহাস তিনি গড়েছিলেন প্রশাসনের মঞ্চে। পিতার ব্যবসা এম এল ডালমিয়া অ্যান্ড কো.-এর দায়িত্ব নিয়ে সফল উদ্যোক্তা হওয়ার পাশাপাশি ক্রিকেট প্রশাসনে যোগ দিয়ে তিনি বদলে দেন ভারতীয় ক্রিকেটের চেহারা।
১৯৭৯ সালে BCCI-তে যুক্ত হয়ে ডালমিয়া দ্রুত প্রভাব বিস্তার করেন। ইন্দরজিৎ বিন্দ্রার সঙ্গে মিলে তিনি ১৯৮৭ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপ ভারতে নিয়ে আসেন, ইডেনে হয় বিশ্বকাপের ফাইনাল। যা ভারতীয় ক্রিকেটের আর্থিক বিপ্লবের সূচনা করে। টেলিভিশন সম্প্রচারের অধিকারের সঠিক ব্যবহার করে তিনি BCCI-কে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী বোর্ডে পরিণত করেন। তার নেতৃত্বে ইডেনে হিরো কাপ আয়োজন আজও বাঙালির মুখে মুখে ফেরে।
১৯৯৭ সালে তিনি প্রথম ভারতীয় হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতি নির্বাচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে আইসিসির আর্থিক ভাণ্ডার প্রায় শূন্য থেকে কোটি কোটি পাউন্ডে গিয়ে দাঁড়ায়। তিনি এশীয় ক্রিকেট শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্য ভেঙে দেন এবং দক্ষিণ আফ্রিকাকে পুনরায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরিয়ে আনেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ক্ষমতার ভারসাম্য খুব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সামলেছিলেন—ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার দাপট ভেঙে এশিয়ার দেশগুলিকে একজোট করেছিলেন এবং ভারতীয় ক্রিকেটকে শীর্ষে তুলেছিলেন।
আইসিসি-তে সফল মেয়াদের পর তিনি ২০০১ সালে আবারও BCCI-র সভাপতি হন। ২০০৫ সালে বিতর্ক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে তাঁকে সরে দাঁড়াতে হলেও তিনি ২০০৬ সালে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গলের সভাপতি হিসেবে প্রত্যাবর্তন করেন। জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি সক্রিয়ভাবে বাংলার ক্রিকেটকে পরিচালনা করেছেন।
২০১৫ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর ৭৫ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হন। তবে তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার আজও অমলিন। ভারতীয় ক্রিকেটকে তিনি শুধু খেলার মঞ্চেই নয়, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত দিক থেকেও বিশ্বের শীর্ষস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন। আজও তাঁকে স্মরণ করা হয় এক দূরদর্শী নেতা, অসাধারণ সংগঠক এবং ভারতীয় ক্রিকেটের প্রকৃত রূপকার হিসেবে।

     

বিজ্ঞাপন

Goto Top